
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর হাজী ফুল মাহমুদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলতাফুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তিনি বর্তমানে নিজ এলাকা ছেড়ে পাশের জেলা শেরপুরে অবস্থান করছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধান শিক্ষক হিসেবে হাজিরা খাতায় তিনি সর্বশেষ স্বাক্ষর করেছেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এরপর প্রায় ২১ মাস ধরে বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হলেও নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অডিট রিপোর্টে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়াসহ একাধিক আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক আলতাফুর রহমানের নিয়োগে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। এছাড়া প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও বিএড ডিগ্রির ঘাটতির কারণে তাঁর আবেদন বাতিলযোগ্য ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
এ অবস্থায় ২০০৪ সালের ১ মে থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উত্তোলিত ৩৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪৩ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের আরও ছয় শিক্ষকের উত্তোলিত মোট এক কোটি ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার ১১২ টাকা ফেরত চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে সহকারী শিক্ষক আ. রহিম, মোহাম্মদ নিয়াজ, আ. রাজ্জাক ও মোহাম্মদ আলমগীরের নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জাতীয় দৈনিকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করা এবং বিধিসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে তাঁদের উত্তোলিত কয়েক লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চাওয়া হয়েছে।
এছাড়া সহকারী শিক্ষক দিলরুবা ও মোহাম্মদ আলামিনের বিরুদ্ধে বিএড ডিগ্রি সংক্রান্ত বেতন স্কেলে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান থেকে বিএড সম্পন্ন না করেও তারা উচ্চতর স্কেলে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন।
বিদ্যালয়ের জমিদাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলহাজ সুন্দর আলী অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষকের অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁর ওপর হামলা চালানো হয় এবং তিনি শারীরিকভাবে আহত হন। মামলা করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার রহমান সাঈদ বলেন, ২০০০ সালের পর থেকে বিদ্যালয়টি কার্যত এককভাবে পরিচালনা করছেন প্রধান শিক্ষক আলতাফুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন নিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে শেরপুরে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।
ম্যানেজিং কমিটির সাবেক সদস্য রতন প্রামাণিকও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বলেন, কয়েকজন কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগত নানা বিতর্কেও জড়িয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে দেখেননি। ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, ভর্তি হওয়ার পর থেকে তিনি কখনো প্রধান শিক্ষককে দেখেনি। অন্য শিক্ষার্থীরাও প্রায় একই ধরনের তথ্য দিয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফা আক্তার বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে শিক্ষা অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল জানান, তদন্তের জন্য একাধিকবার বিদ্যালয়ে গেলেও প্রধান শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। নোটিশ দেওয়ার পরও তিনি হাজির হননি এবং তদন্তে সহযোগিতা করেননি। তদন্তে তাঁর দীর্ঘদিন অনুপস্থিতিসহ নানা অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলতাফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলম বলেন, বর্তমানে অডিট সংক্রান্ত জবাব সরাসরি অডিট ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে জমা দিতে হয়। জবাব সন্তোষজনক না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়।
Citizens Against Corruption (CAC)
18/1 Naya polton, 2nd floor, Dhaka -1000, Bangladesh.
+880 1979-778844 +880 1712-027525
info@cacsbd.com
© Copyright 2025 - Citizens Against Corruption (CAC)